1. joyantagoswami7165@gmail.com : Joyanta Goswami : Joyanta Goswami
  2. faisalyounus1990@gmail.com : Developer :
  3. newspointsylhet@gmail.com : News Point : News Point
শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪:২৩ অপরাহ্ন

নিউজ পয়েন্ট সিলেট

শুক্রবার, ২৭ আগস্ট, ২০২১

টক অব দ্য ওয়ার্ল্ডঃ অসংখ্য প্রশ্নের সমাহার, কি হতে যাচ্ছে আফগানিস্তানে?


কট্টরপন্থী তালেবান বাহিনী কর্তৃক ঝড়ো গতিতে আফগানিস্তানের ক্ষমতা দখল এখন টক অব দ্য ওয়ার্ল্ড। কী হতে চলেছে? তালেবান শাসন কি সুসংসহ হবে, স্থিতিশীলতা কি আফগানিস্তানে ফিরে আসবে, ৪ কোটি আফগানবাসী আবার কি শান্তিতে জীবনযাপন করতে পারবে? নারী পুরুষ কি সমানভাবে নিজ নিজ ভাগ্য উন্নয়নের সুযোগ পাবে? বহু প্রশ্ন। কিন্তু এসব প্রশ্নের নিশ্চিত কোনো উত্তর কারো কাছে নেই। বেশিরভাগ রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকগণ খুবই সন্দিহান।

কী হতে যাচ্ছে আফগানিস্তানে?
মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আলী শিকদার (অব.)

তালেবান কর্তৃক আফগানিস্তানে শান্তি ফিরে আসবে এমনটা আবার যৌক্তিক কারণ কেউ খুঁজে পাচ্ছেন না। পাকিস্তানই একমাত্র রাষ্ট্র, যারা তালেবানের ক্ষমতা দখলকে স্বাগত জানিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান বলেছেন, দাসত্ব মুক্ত হয়ে এবারই প্রথম আফগানিস্তান স্বাধীন হয়েছে। অন্য কোনো রাষ্ট্র অভিনন্দন বা ইতিবাচক বার্তা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে দেয়নি। ১৯৯৬-২০০১ মেয়াদে, পাঁচ বছরে মাত্র তিনটি দেশ, পাকিস্তান, সৌদিআরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত তালেবান সরকারকে স্বীকৃতি দিয়েছিল। এবার সৌদিআরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত এখনো নিশ্চুপ আছে। বৈশ্বিক যুগে বৃহত্তর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের স্বীকৃতি ও সহযোগিতা ছাড়া তালিবানি শাসন যেমন সংহত হবে না, আফগানিস্তানে শান্তিও ফিরে আসবে না।


আমেরিকা চলে যাওয়ায় সেখানে চীন তালেবানের পাশে দাঁড়াবে এমন পূর্বাভাস স্পষ্টভাবেই দেখা যাচ্ছে। তবে এই উদ্যোগে চীনকে পিছন থেকে টেনে ধরবে জিনজিয়াং প্রদেশের উইঘুর মুসলমানদের মধ্য থেকে গড়ে ওঠা সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন। আফগান তালেবানের কাজিন ব্রাদার পাকিস্তানি তালেবান সম্প্রতি সময়ে পাকিস্তানের অভ্যন্তরে কর্মরত চীনা নাগরিকদের ওপর বেশ কয়েকবার আক্রমণ চালিয়েছে। সর্বশেষ এই আগস্ট মাসের প্রথম দিকে দূর নিয়ন্ত্রিত বোমার বিস্ফোরণ ঘটিয়ে ৯জন চায়নিজ নাগরিককে তারা হত্যা করেছে। মতাদর্শের মিল থাকায় তুরস্কের এরদোগান সরকার এগিয়ে আসবে এবং তালেবানও সেটা চাইবে, যা শেষ বিচারে চীনকে ভাবিয়ে তুলবে। কারণ, উইঘুর বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনে তুরস্কের ইন্ধন রয়েছে বলে অভিযোগ আছে। কান টানলে মাথা আসার মতো চীন আসলে রাশিয়া আসবে। তবে রাশিয়া সবসময় অনগার্ডে থাকবে, যাতে তালিবানি বিজয় যেন প্যান ইসলামি চরিত্র ধারণ না করে মধ্য এশিয়ার মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশসমূহে ছড়িয়ে না পড়ে। সেটা হলে চেচনিয়া নিয়ে আবার সমস্যায় পড়বে রাশিয়া।

ইউরোপসহ পশ্চিমা বিশ্ব সংশয়, সন্দেহ ও শঙ্কা নিয়ে সব কিছু পর্যবেক্ষণ করছে। এতদিনের অন্যতম উন্নয়ন অংশীদার ভারত পূর্বের মতো আফগানিস্তানে থাকতে পারবে তা এখন পর্যন্ত কঠিন দুরাশাই মনে হচ্ছে। অন্যদিকে চীন-রাশিয়া সহযোগিতার হাত বাড়ালেও একটা পিছুটান থাকবে, বিধায় গত ২০ বছর আমেরিকা যেভাবে আফগানিস্তানের পুনর্গঠন ও উন্নয়নে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ঢেলেছে, তেমনটি চীন-রাশিয়া থেকে আশা করা কঠিন। সুতরাং ক্ষমতা দখল করলেও তালেবানের শাসনে এখন হিমালয়সম সংকট, যার সহজ কোনো সমাধান নেই।


পাকিস্তানের অর্থনীতি এখন ভঙ্গুরদশা, অন্যের জন্য বড় কিছু করার সামর্থ্য নেই। এই পরিস্থিতিতে তালেবান কর্তৃপক্ষ হয়তো আপাতত একটা ভাল মানুষী চেহারায় আবির্ভূত হওয়ার চেষ্টা করতে পারে এবং সরকারের মধ্যে অন্যান্য গ্রুপকেও হয়তো সংযুক্ত করতে চাইবে। কিন্তু সে চেষ্টাও সফল হওয়ার সম্ভাবনা কম। আফগানিস্তানে বহু জাতিগোষ্ঠীর ভাষা, সংস্কৃতি এবং ইসলাম ধর্মের অনুশীলন দৃষ্টিভঙ্গিতেও বিস্তর পার্থক্য রয়েছে। এ রকম একটা সংমিশ্রিত জনগোষ্ঠীর সমাজে ধর্ম, বর্ণ, গোত্র, জাতি, উপজাতি সকলকে ঐক্যবদ্ধ করার জন্য বহুত্ববাদের দর্শনই মূলমন্ত্র, যা তালেবানের কাছে একেবারে অগ্রহণযোগ্য।

আফগানিস্তানে বর্তমান অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির দিকে তাকালে এক ভয়ার্ত চিত্র ভেসে ওঠে, আশার কিছু দেখা যায় না। তালেবানের টপ নেতৃত্ব মোল্লা আবদেল গনি বারাদার, প্রয়াত মোল্লা ওমরের ছেলে মোল্লা ইয়াকুব, হিবাতুল্লাহ আকুন্দাজা, সিরাজউদ্দিন হাক্কানীসহ সকলে পাকিস্তানের মাদ্রাসা শিক্ষায় শিক্ষিত, যেখানে আধুনিক বিজ্ঞান  এবং লিবারেল আর্টসের মতো সৃজনশীল বিষয় অন্তর্ভুক্ত নয়। তাহলে বিশ্বব্যাপি ভূ-রাজনীতির বহুমুখী চিন্তা, দর্শন, সমীকরণ সম্পর্কে বৃহৎ উপলব্ধি ব্যাতিরেকে সংঘাতময় এই পৃথিবীতে কিভাবে তারা ভারসাম্য রক্ষা করবে, সে এক বিশাল প্রশ্ন। ইরানের সফল বিপ্লবী নেতা আয়াতুল্লাহ রহুউল্লাহ খোমেনি ২০ বছর ফ্রান্সে থেকে পশ্চিমা বিশ্বের জীবন দর্শন ও মূল্যবোধকে হৃদয়ঙ্গম করেছেন। রাষ্ট্র, রাজনীতি ও মানবদর্শন শুধু একটা ধর্মের সীমাবদ্ধ করে বুঝতে চাইলে কেবল একটা খণ্ডচিত্র পাওয়া যায়, যা দিয়ে বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলানো যায় না।

আফগানিস্তানের জনসংখ্যা প্রায় ৪ কোটি। এর মধ্যে প্রায় ২ কোটি তালেবানের ভয়ে নিজস্ব ঘরবাড়ি ছেড়ে দেশের অভ্যন্তরে ভাসমান জীবনযাপন করছে, প্রায় ২৬-৩০ লাখ মানুষ বছরের পর বছর বিদেশের মাটিতে শরণার্থী হয়ে আছে। জনগণের আরেকটি অংশ প্রাণ ভয়ে দেশত্যাগ করার জন্য হুড়োহুড়ি করছে কাবুল বিমানবন্দরে। প্রায় সাড়ে ছয় লাখ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের একটা দেশ, তার অর্ধেকের বেশি জনসংখ্যা  যদি পলায়নপর অবস্থায় ভীত-সন্ত্রস্ত থাকে, তাহলে দেশ পুনর্গঠনে এবং অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি উৎপাদনে অংশ নিবে কারা। প্রশ্ন উঠেছে, এ সমস্ত ভীত-সন্ত্রস্ত মানুষের মনে তালেবানরা কি আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারবে।


নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে দেখলাম, কাবুলের বাইরে তালেবান সৈন্যরা ঘরে ঘরে গিয়ে সুন্দরী মেয়ের অভিভাবকদের হুমকি দিচ্ছে, পাপ মোচন করতে চাইলে তালেবান জিহাদী সৈনিকদের সঙ্গে মেয়ের বিয়ে দিতে হবে। আফগানিস্তানের নারী ফুটবল ও নারী ক্রিকেট দল আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সম্ভাবনার উজ্জ্বল ভূমিকা রাখতে সক্ষম হয়েছে। তালেবানের আফগানিস্তানে নারীরা কি ফুটবল-ক্রিকেট খেলতে পারবে। নারী ফুটবল দলের ক্যাপ্টেনকে কয়েকদিন পূর্বে একটা টেলিভিশনে দেখলাম ভয়ার্তকণ্ঠে, কম্পিত হৃদয়ে বলছে, ফুটবল খেলা হয়তো আর কোনোদিন হবে না। গত ২৩ আগস্ট দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে এমন একটি সংবাদ। একজন নারী খেলোয়ারের সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে প্রকাশিত সংবাদে বলা হয়- ‘একসময় এই ফুটবলারই বিদেশের মাটিতে আফগানিস্তানের জাতীয় সংগীত গেয়ে দেশকে জেতানোর চোয়ালবদ্ধ প্রতিজ্ঞা নিয়ে ফুটবল মাঠে নামতেন। অথচ এখন কিনা জীবন বাঁচাতে তিনিই ভুলে যেতে চান নিজের ফুটবলার সত্তা! আগুনে পুড়িয়ে ফেলেছেন খেলার বুট, প্রিয় জার্সি।’ অন্যদিকে তালেবান ইতিমধ্যেই ঘোষণা দিয়েছে শরীয়া আইন অনুসারে নারীদের অধিকার দেওয়া হবে।

তাদের শরীয়া আইনের চিত্র ১৯৯৬-২০০১ মেয়াদে দেখা গেছে। সে সময়ে যে শরীয়া আইন ছিল তা কি ২০২১ সালে এসে বদলে যাবে? তালেবানরা শরীয়াকে যে ব্যাখ্যা দেয়, তার সঙ্গে বিশ্বের অনেক বড় বড় ইসলামিক পণ্ডিতরা দ্বিমত পোষণ করেন। এই মে মাসে মেয়েদের একটা হাইস্কুলে আক্রমণ চালিয়ে প্রায় ৯০ জন কিশোরীকে হত্যা করেছে তালেবান বাহিনী। তালেবানের অভিযোগ ঐ স্কুলে পুরুষ শিক্ষক ছিল বিধায় সেখানে মেয়েদের শিক্ষাগ্রহণ শরীয়া আইনের পরিপন্থি। কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে এককভাবে শুধু নারী শিক্ষকদের দ্বারা কি শিক্ষা তারা দিবে। জ্ঞানের রাজ্যকে পুরুষ-নারীদের মধ্যে আলাদা আলাদাভাবে সীমাবদ্ধ করে দিলে জ্ঞানের সম্পূর্ণতা বিনষ্ট হয়ে যায়।
 

আজকের লেখায় শুধু আফগানিস্তানের অভ্যন্তরীণ বিষয়টিই তুলে ধরলাম। ১৯৯৪ সালে আবির্ভূত হওয়ার পর গত ২৭ বছরে তালেবানের এমন কোনো রেকর্ড বা উদাহরণ নেই, যার ওপর ভিত্তি করে বলা যায় আফগানিস্তানে ভালো কিছু হতে যাচ্ছে।
 লেখক: গবেষক এবং রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক।
আপনার মতামত দিন
এই বিভাগের আরও খবর

সিলেটের সর্বশেষ
© All rights reserved 2020 © newspointsylhet