
শফিক আহমদ শফি
মঙ্গলবার, ৮ ফেব্রুয়ারী, ২০২২
বাংলাদেশী বরেণ্য ইসলামিক স্কলার্সদের মধ্যে অন্যতম, বহুভাষী প্রাজ্ঞ ব্যক্তিত্ব আল্লামা হাবিবুর রহমান কুরআন-হাদীসের উপর অগাধ পাণ্ডিত্য এবং আরবী ভাষায় বিশেষ দক্ষতার ফলে দেশে-বিদেশের মুসলিম সমাজকে জাগাতে পেরেছেন। অসংখ্য মসজিদ-মাদরাসা প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। শিক্ষার আলোর ছড়িয়েছেন সর্বত্র। সিলেটের কৃতি সন্তান বিশিষ্ট ইসলামী ব্যক্তিত্ব আল্লামা হাবিবুর রহমান ইহজগতের সকল হিসাব নিকাশের সমাপ্তি করে মাবুদের ডাকে ৭ ফেব্রুয়ারি ২০২২ বাংলাদেশ সময় সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টায় নিজ বাড়িতে তিনি ইন্তেকাল করেছেন। ইন্না-লিল্লা-হি ওয়া ইন্না- ইলাইহি রা-জিউ-ন। মুত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৮ বছর।
দেশ বিদেশে সর্বজনের কাছে ‘মুহাদ্দিস ছাহেব’ নামে খ্যাত আল্লামা হবিবুর রহমান সিলেটের জকিগঞ্জ উপজেলার রারাই গ্রামে ১৯৩৪ সালে জন্মগ্রহণ করেন। শিক্ষাজীবনে তিনি ভারতের বদরপুর সিনিয়র মাদরাসা, কানাইঘাট সড়কের বাজার আহমদিয়া মাদরাসা ও গাছবাড়ি জামেউল উলুম মাদরাসায় অধ্যয়ন করেছেন। ১৯৫৫ সালে পূর্ব পাকিস্তান মাদরাসা এডুকেশন বোর্ডের অধীন আলিম পরীক্ষায় সম্মিলিত মেধা তালিকায় দ্বাদশ এবং ১৯৫৭ সালে ফাজিল পরীক্ষায় সম্মিলিত মেধা তালিকায় তৃতীয় স্থান লাভ করেন। ১৯৫৯ সালে হাদীস বিভাগে কামিল পরীক্ষায়ও সম্মিলিত মেধা তালিকায় দ্বাদশ স্থান অর্জন করেন।
আল্লামা হাবিবুর রহমান কর্মজীবনের শুরুতে ইছামতি দারুল উলুম সিনিয়র মাদরাসা এবং ফুলবাড়ি আজিরিয়া মাদরাসায় শিক্ষকতা করেছেন। ১৯৬৩ সালের নভেম্বর মাসে সৎপুর দারুল হাদীস মাদরাসায় মুহাদ্দিস হিসেবে নিযুক্ত হন। ১৯৭৪ সালের ১৫ জানুয়ারি ইছামতি দারুল উলুম মাদরাসায় অধ্যক্ষ পদে যোগদান করেন। ১৯৭৬ সালের অক্টোবরে আবারো সৎপুর দারুল হাদীস মাদরাসায় অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব গ্রহন করেন।
আল্লামা হাবিবুর রহমান ১৯৭৭ সালে সংযুক্ত আরব আমিরাতে গমন করেন। প্রথমে উম্মুল কুওয়াইন শহরে একটি মসজিদে ইমাম ও খতিব হিসেবে নিযুক্ত হন। এরপর প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে সে দেশের বিচার বিভাগে যোগদান করেন। ১৯৮১ সালে দেশে ফিরে আসা পর্যন্ত তিনি উম্মুল কুওয়াইন কোর্টে বিচারক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। পাশাপাশি একটি মসজিদে খতিবের দায়িত্ব পালন করেছেন।
স্বদেশে ফিরে ১৯৮২ সালের সেপ্টেম্বরে আবারও তিনি ইছামতি মাদরাসার অধ্যক্ষ পদে যোগদান করেন। ১৯৯৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর অবসর গ্রহণের পূর্ব পর্যন্ত অত্যন্ত দক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালন করেছেন। সেখানে আলিম, ফাজিল ও কামিল শ্রেণীর সরকারি মঞ্জুরি এবং স্বীকৃতি আদায়ে বিশেষ ভূমিকা পালন করেন। এছাড়া মাদরাসার ভবন ও মসজিদ নির্মানে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য ।আল্লামা হবিবুর রহমান ইসলাম চর্চা ও ইসলামী ঐতিহ্য প্রত্যক্ষ করার জন্য অনেক দেশ সফর করেছেন। তিনি ২০০৮ সালের অক্টোবর মাসে সিরিয়া, ২০১০ সালের এপ্রিল মাসে মরক্কো এবং ২০১৮ সালের অক্টোবর মাসে মিশর সফর করেন। সফরের সর্বত্রই ইসলামী চিন্তাবিদগণের সাথে ব্যাপক ভাবে সাক্ষাৎ ও মতবিনিময় করেছেন।
২০০৯ সালে লন্ডন এসে আল্লামা হবিবুর রহমান প্রায় বছর খানেক ছিলেন। সে সময় প্রতি শনিবার দারুল হাদীস লতিফিয়ায় শামায়েলে তিরমিজি থেকে দারস পেশ করতেন। এতে বিলেতের বিভিন্ন শহর থেকে বিপুল সংখ্যক উলামা অংশগ্রহণ করেছেন। ইউকে সহ বিভন্ন স্থানে মসজিদ ও ইসলামি সেন্টার প্রতিষ্ঠায় তাঁর ভূমিকা প্রশংসার দাবি রাখে।
রাজনৈতিক জীবনে আল্লামা হবিবুর রহমান নেজামে ইসলাম পার্টির সাথে জড়িত ছিলেন। ১৯৭০ সালে অনুষ্ঠিত জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে নেজামে ইসলামের মনোনয়নে তখনকার সিলেট-৭ আসনে (জকিগঞ্জ, বিয়ানীবাজার ও কানাইঘাট) এমএনএ পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। পরবর্তীতে তিনি বাংলাদেশ আঞ্জুমানে আল-ইসলাহ’র সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৬ সালে আঞ্জুমানে আল-ইসলাহ মনোনীত ও সম্মিলিত সংগ্রাম পরিষদ সমর্থিত প্রার্থী হিসেবে জাতীয় নির্বাচনে সিলেট-৫ আসনে (জকিগঞ্জ-কানাইঘাট ) প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন।
আল্লামা হবিবুর রহমান ব্যাপকভাবে ইসলামী সাহিত্য অধ্যয়ন করতেন। তাঁর জ্ঞানগর্ভ ইসলামী আলোচনায় চিন্তাশীল লোকেরা প্রভাবিত হতেন। তিনি বলতেন, ব্যক্তিগত জীবনে আল্লাহর বিধান অনুসরণের সাথে সাথে সামষ্টিক জীবনে সে বিধান কায়েমে আত্মনিয়োগ করতে হবে। আলেমদের প্রধান কাজ হচ্ছে, আদ্দা’ওয়াতু ইলাল্লাহ বা আল্লাহর দিকে লোকদেরকে ডাকা। সারাটা জীবন সমাজে ইসলামের প্রধান্য প্রতিষ্ঠার জন্য সম্মিলিত প্রয়াসের প্রয়োজনীয়তা তিনি তুলে ধরেছেন।
জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দেয়ার জন্য আল্লামা হবিবুর রহমান একটি অত্যাধুনিক গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠা করেছেন। নতুন প্রজন্ম যাতে পার্থিব বিষয়ে পারদর্শিতা অর্জনের পাশাপাশি ইসলামী জ্ঞানে সমৃদ্ধ হয়ে গড়ে উঠে। আল-হাবীব গবেষণা গ্রন্থাগারে আরবি, উর্দু, বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় রচিত নতুন পুরাতন বিপুল সংখ্যক বই-কিতাব সংগৃহীত হয়েছে। এরমধ্যে তাঁর নিজের লেখা ১৭টি গ্রন্থ রয়েছে।
সংসার জীবনে সফল আল্লামা হবিবুর রহমান চার পুত্র ও তিন কন্যা সন্তানের জনক। লন্ডন প্রবাসী সুলেখক ও অনুসন্ধানী আলেম আবদুল আউয়াল হেলাল তার পুত্র। আর জামাতা শায়েখ আব্দুস সালাম আল মাদানী একজন খ্যাতিমান ইসলামিক স্কলার।
পরিশেষে মরহুম হাবিবুর রহমানের রুহের মাগফেরাত কামনা ও শোক সন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন করছি এবং আল্লাহ যেন তাঁকে জান্নাতুল ফেরদৌসের বাসিন্দা করেন এই কামনা করছি।
লেখক ঃ সিলেট বুরো প্রধান, দি নিউ নেশন।